জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:

টেকনাফের নাফ নদীতে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ ও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ এলাকায় শত শত দর্শনার্থীর সামনে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থলটি হ্নীলা বিজিবি (বিওপি) ক্যাম্পের নিকটবর্তী হওয়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজিবির ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় টেকনাফজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মে (শনিবার) বিকেল পৌনে ৫টার দিকে হ্নীলা সীমান্তের ১ নম্বর স্লুইস গেট সংলগ্ন নাফ নদীর তীরে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ দ্রুতগতির দুটি নৌকা স্লুইস গেটের দিকে আসতে দেখা যায়। সে সময় সীমান্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ এলাকায় শত শত দর্শনার্থী অবস্থান করছিলেন।

একপর্যায়ে দুটি নৌকা স্লুইস গেটের ভেতরে প্রবেশ করলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় ছোট নৌকায় থাকা দুই রোহিঙ্গা যুবক পানিতে ঝাঁপ দিয়ে তীরে উঠে আসেন। পরে অস্ত্রধারীরা জালসহ নৌকাটি নিয়ে দ্রুত মিয়ানমারের দিকে চলে যায়।

ঘটনার সময় উপস্থিত দর্শনার্থীরা পুরো দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকেই বিজিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের দাবি, বিজিবি চাইলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে পারত। তবে ঘটনার পরপরই বিজিবির একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তীরে উঠে আসা দুই রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হ্নীলা সীমান্তের চৌধুরীপাড়া সংলগ্ন ক্ষেরের দ্বীপ, নাকপুরার দ্বীপ, কাব্যিক দ্বীপ, দমদমিয়া সীমান্তের লাল দ্বীপ, হোয়াইক্যং সীমান্তের হাউজে দ্বীপ, শাহাজানের দ্বীপ, রইক্ষ্যংয়ের দ্বীপ, তুতার দ্বীপ ও বিলাইচ্ছড়ি দ্বীপসহ নাফ নদীতে জেগে ওঠা বিভিন্ন চরে দীর্ঘদিন ধরে আরসা, আরএসও, মাহাদ ও নবী হোসেন গ্রুপের সদস্যরা অবস্থান করছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়াবা পাচার, লুটপাট ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।

টেকনাফ প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার টেকনাফ প্রতিনিধি আলহাজ মুহাম্মদ তাহের নঈম বলেন, “বিজিবি ক্যাম্পের অদূরে শত শত মানুষের সামনে রোহিঙ্গা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অস্ত্র প্রদর্শন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সীমান্ত এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

হ্নীলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও প্রত্যক্ষদর্শী বাহাদুর শাহ তপু বলেন, “স্লুইস গেট এলাকায় গুলির শব্দ শোনার পর দেখি দুই ব্যক্তি নৌকা থেকে লাফ দিয়ে বেড়িবাঁধে উঠে আসে। পরে তিনজন অস্ত্রধারী রোহিঙ্গাকে নৌকা ও জাল নিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যেতে দেখি। ঘটনার পর থেকে সীমান্ত এলাকার মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, “জনসমক্ষে অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় সীমান্ত এলাকার মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা জরুরি।”

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) টেকনাফ উপজেলা আহ্বায়ক সায়েম সিকদার এ ঘটনাকে সরকারের ভূ-রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে ৬৪ বিজিবি রাত ১টা ১৯ মিনিটে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হ্নীলা বিওপি থেকে প্রায় ৫০০ গজ উত্তরে স্লুইসপাড়া বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় দুই জেলেসহ একটি নৌকাকে তিনজন রোহিঙ্গা ডাকাত ধাওয়া করে। ডাকাতরা নৌকাটি থামাতে বললেও জেলেরা তা না থামালে তারা ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় জেলেরা পানিতে ঝাঁপ দেয় এবং ডাকাতরা জাল ও নৌকাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বিজিবি অভিযান চালিয়ে ইমাম হোসেন ও মো. নুরুল আমিন নামে দুই রোহিঙ্গাকে আটক করে।

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনিক চৌধুরী বলেন, “ঘটনার পর থেকে বিজিবি সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা একটি জাতীয় বিষয়। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।”

নাফ নদীতে জেগে ওঠা বিভিন্ন দ্বীপে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, “সেখানে কেন সশস্ত্র রোহিঙ্গারা অবস্থান করবে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগামী আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি আলোচনায় আনা হবে।”